বৃহস্পতিবার  ৩০শে মার্চ, ২০১৭ ইং  |  ১৬ই চৈত্র, ১৪২৩ বঙ্গাব্দ  |  ৩রা রজব, ১৪৩৮ হিজরী
1487269809

সিলেটে পর্যটন স্পটে নিরাপত্তার অভাব গত এক দশকে অর্ধশত মৃত্যু

ফাগুনের ছোঁয়া লেগেছে সিলেটের পর্যটন স্পটগুলোতে। প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটক এসে ভিড় করছেন এই ‘ভূ-স্বর্গের’ নয়নাভিরাম সৌন্দর্য দেখতে। পাহাড়, ঝর্ণা, নদী-খাল, হাওর, চা-বাগান, মাধবকুন্ড, ঝর্ণধারা, দিগন্ত বিস্তৃত বোরো ধান ক্ষেত, লালাখাল- এমন নানা প্রাকৃতিক ঐশ্বর্য ছড়িয়ে আছে এই অঞ্চলের সর্বত্র। দূরদূরান্ত থেকে আসা নানা বয়সী পর্যটকরা ঘুরে ঘুরে নিজেদের নয়ন সার্থক করেন। কিন্তু মাঝে মাঝে তাদের আনন্দে পড়ে বিষাদের কালো ছায়া। দুর্ঘটনায় মারা যান অনেক পর্যটক।

প্রকৃতি কন্যা জাফলং-এর পিয়াইন নদী আর জৈন্তার লালা খালের হিমশীতল পানিতে গোসল করতে গিয়ে অনেকেই লাশ হয়ে ফিরে যান। গত কয়েক বছর যাবতই এরকম মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে যা ভাবিয়ে তুলেছে অনেককে। সম্প্রতি সিলেটের লালাখালে বেড়াতে এসে চোরাবালিতে আটকা পড়ে দুই পর্যটকের মৃত্যু হয়। এরা হচ্ছেন-ঢাকার মো. সাঈদ (২৫) ও চাপাইনবাবগঞ্জের ছেলে ইসহাক ইব্রাহিম (২৫)। দুজনেই কিশোরগঞ্জের জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী। চোরাবালিতে ডুবে তাদের এমন মর্মান্তিক মৃত্যু দেশ জুড়ে রীতিমত চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। সিলেটের অনেকেই বলেছেন বিপজ্জনক স্থানগুলো ভালো করে চিহ্নিত করে সেখানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা দরকার।

সিলেটের পর্যটন এলাকা গোয়াইনঘাটের উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল হাকিম বলেন, জাফলং, লালাখাল, লোভাছড়া প্রভৃতি পর্যটন কেন্দ্রে পর্যাপ্ত নিরাপত্তার অভাব রয়েছে। এসব পর্যটন কেন্দ্রে ট্যুরিস্ট পুলিশ নিয়োগ জরুরী।

নিরাপত্তার বিষয়ে মাঝে মধ্যে প্রশাসনের বেশ তত্পরতা লক্ষ্য করা গেলেও পরে অবস্থা আবার       যেই কে সেই। বিপজ্জনক স্থানগুলোর কোন কোনটিতে সতর্কতামূলক সাইন বোর্ড বা লাল ফ্ল্যাগ লাগানো থাকলেও অনেক সময় পর্যটকরাও সেগুলো ভ্রুক্ষেপ করেন না এ কথাও অস্বীকার করার উপায় নেই। সিলেটের জাফলং ও লালাখালে গোসল করতে গিয়ে গত এক দশকে অন্তত অর্ধশত তরুণের প্রাণ ঝড়ে গেছে। এদের বেশির ভাগই বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজের বা কোন শিক্ষা প্রতিষ্টানের শিক্ষার্থী। মাধবকুন্ড পাহাড় থেকে পড়ে কত লোকের প্রাণ গেছে তার সঠিক হিসাব নেই। তবে বেশ দেরীতে হলেও প্রশাসনের কঠোর তদরকীর ফলে সেখানে এখন দুর্ঘটনার মাত্রা শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। সিলেটের অনেকেই বলেছেন আসন্ন বর্ষার আগে সিলেটের পর্যটন স্পটের বিপজ্জনক স্থানগুলো চিহ্নিত করে কঠোরভাবে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়া জরুরী।

কয়েকটি মৃত্যু:

গত ১০ বছরে জাফলং-এর পিয়াইন নদীতে ডুবে অনেকের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটেছে। ২০০৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি সিলেটের গোয়াইনঘাটের মুসা মিয়া, ১৬ আগস্ট একই উপজেলার ফখরুল ইসলাম, ২০০৮ সালের ৯ নভেম্বর ঢাকার দিলশাদ আহমেদ, ২০০৯ সালের ২৬ জানুয়ারি হবিগঞ্জের ইউনুস মিয়া, ৮ মে ঢাকার ফারুক আহমদ, ২১ জুন নরসিংদীর সজিব মিয়া; ২০১০ সালের ২৩ মার্চ ঢাকার খিলগাঁওয়ের তারেক আহমদ, ২০ মে গোয়াইনঘাটের রফিকুল ইসলাম ও গৌরাঙ্গ কর্মকার, ২২ মে জামালপুর জেলার মাদারগঞ্জের মুস্তাকিন তালুকদার ও ঢাকার শাহরিয়ার আহমদ রাব্বি, ১২ সেপ্টেম্বর ঝালকাঠির রুহুল আমিন খান রুমি, সেপ্টেম্বরে ঝালকাঠির রুহুল আমিন খান রুমি; ২০১২ সালের ২২ আগস্ট ঢাকার ফাহাদ উদ্দিন, ৩০ আগস্ট মৌলভীবাজারের হিমেল রাজ; ২০১৩ সালের ১৭ আগস্ট ঢাকার শুভ আহমদ, ২৫ অক্টোবর ঢাকার ইমরান হোসেন; ২০১৪ সালের ৩০ মে মাদারিপুর জেলার সদর উপজেলার চলকিপুরের মোহাম্মদ ইব্রাহিম, আগস্টে শ্রীমঙ্গলের শাকিল মিয়া, মামুন হোসেন, সাদেক হোসেন এবং সিলেটের কামরুল ইসলাম পিয়াইন নদীতে ডুবে মারা যান। গত বছরের ২৪ ও ২৫ জুলাই পিয়াইনে মারা যান ঢাকার কবি নজরুল কলেজের শিক্ষার্থী সোহাগ ঘোষ ও অন্তর। এর কিছুদিন পর কুমিল্ল­ার ইব্রাহিম আলী পিয়াইনে ডুবে মারা যান।

এছাড়া বিছনাকান্দি, লালাখাল ও লোভাছড়ায় গত এক দশকে অন্তত ১৫ জন পর্যটক পানিতে ডুবে মারা গেছেন। সর্বশেষ গত ৯ ফেব্রুয়ারী মঙ্গলবার লালাখালে গোসল করতে নেমে চোরাবালিতে ডুবে কিশোরগঞ্জের জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজের দুই শিক্ষার্থীর মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে।