সোমবার  ২০শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ইং  |  ৮ই ফাল্গুন, ১৪২৩ বঙ্গাব্দ  |  ২৩শে জমাদিউল-আউয়াল, ১৪৩৮ হিজরী

বাংলা সাহিত্যে ‘অন্ধকার যুগ’ একটি অপবাদ

নুরুল আমিন রোকন
বাংলা সাহিত্যে তথাকথিত ‘অন্ধকার যুগ’ একটি অপবাদ ছাড়া আর কিছুই নয়। মূলতঃ সে সময়কার বিশেষ করে রাজনৈতিক ও শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত মুসলমান শাসকদের প্রতি একচোখা দৃষ্টিভঙ্গি, মুসলিম শাসনের প্রতি ঈর্ষা কিংবা মধ্যযুগে সৃষ্ট বাংলা সাহিত্যের প্রকৃত আঙিনায় প্রবেশের কষ্টসাধ্য কাজটিকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা, অথবা সে যুুগে রচিত বহু মূল্যবান বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ অবদানকে অস্বীকার করার মানসে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কোন কোন পণ্ডিত নানা জটিলতার কথা বলে সময়টাকে অনুমান নির্ভরতার উপর ছেড়ে দিয়ে ‘অন্ধকার যুগ’ আখ্যা দিয়ে দোষ এড়াবার চেষ্টা করে বিতর্কের ধূম্রজাল সৃষ্টির প্রয়াস পেয়েছেন। কিন্তু যে কারণে একটি ভাষার সাহিত্যের ইতিহাসে দেড়’শ বছর সময়কে অন্ধকার যুগ হিসেবে অভিহিত করা যায় এ ক্ষেত্রে তা বিদ্যমান নয়। যে সব পণ্ডিত ওই সময়টাকে অন্ধকার যুগ চিহ্নিত করেছেন’ ঐতিহাসিক সত্যকে অস্বীকার করার সুযোগের অভাবে পরবর্তীতে তাদেরও কেউ কেউসহ বহু পণ্ডিত এবং সাহিত্য গবেষক সে সময়ে সৃষ্ট মূল্যবান সাহিত্যের কথা তুলে ধরেছেন।
বাংলা সাহিত্যের যুগ বিভাগে ১২০০ থেকে ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়কে মধ্যযুগ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। আর মধ্যযুগের সূচনা লগ্ন ১২০০ থেকে ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দেড়’শ বছর সময়কে ‘অন্ধকার যুগ’ হিসেবে চিহ্নিত করার তৎকালীন পণ্ডিতদের প্রয়াসের মধ্যদিয়ে মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় ছেদ ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে। সাহিত্যের ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় এই বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা মূলত সে সময়কার সৃষ্ট সাহিত্যের মূল্যবান অবদানকে অস্বীকার করারই নামান্তর। মধ্যযুগের সাহিত্যের অস্পষ্ট আঙিনায় যথাযথ আলোকপাত না করে এবং সৃষ্ট সাহিত্যের মূল্যবান সম্পদগুলো খতিয়ে না দেখে পণ্ডিতের দায়িত্বে অবহেলা এবং লুপ্ত সাহিত্যের সম্পদ অনুসন্ধানের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উদঘাটনের ক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে মুসলিম শাসন বিদ্বেষী মনোভাবের প্রাধান্যে অনুমাননির্ভর সিদ্ধান্তে (১২০০-১৩৫০) সময়কে অন্ধকার বা তামস যুগ হিসেবে চিহ্নিত করে বিতর্কের সৃষ্টি করা হয়েছে।
ইখতিয়ার উদ্দিন বিন মুহম্মদ বখতিয়ার খিলজি ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে বিনা বাধায় এবং বিনা রক্তপাতে নদীয়া জয় করে বাংলায় মুসলমান শাসনের সূচনা করেন। মাত্র ১৭ জন অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে অতর্কিতে লক্ষণ সেনের রাজধানী নদীয়ায় প্রবেশ করলে বাংলায় সেন বংশের শেষ শাসক অশীতিপর বৃদ্ধ লক্ষণ সেন পিছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে গেলে এই বিজয় সূচিত হয়। তুর্কি বিজয়ের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশে মুসলমান শাসনের শুরু হলে দেড়’শ বছর এর স্থায়িত্ব ধরে নিয়ে এ সময়ে উল্লেখযোগ্য সাহিত্য সৃষ্টি সম্ভব ছিলনা অনুমান করে এর পক্ষে দায়সারা যুক্তি উপস্থাপন করেন। শামসুদ্দিন ইলিয়স শাহ ১৩৪২ সালে গৌড়ের সিংহাসন দখলে নিয়ে দিল্লির শাসনমুক্ত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। তার পুত্র সেকান্দর শাহের শাসনামলে আবির্ভাব হয় কবি বড়– চণ্ডীদাসের। এই বড়– চণ্ডীদাসের রচিত ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কাব্যই মধ্যযুগে বাংলা সাহিত্যের প্রথম নিদর্শন।
বিনা বাধায় এবং রক্তপাতহীন অবস্থায় নদীয়া বিজয়ের মধ্যদিয়ে বাংলায় মুসলমান শাসনের সূচনা হওয়ার পর সেখানে হত্যাযজ্ঞ, হামলা, আগ্রাসন, ধ্বংসযজ্ঞ এসব কেবল কল্পনায়ই হতে পারে এবং নিন্দুকেরাই তার প্রচার কাজে যুক্ত থাকতে পারে। এ সময় বিজাতীয় মনোভাবাপন্ন ইতিহাসকারেরা মনে করেছেন মধ্যযুগের ‘দেড়’শ দু’শ কিংবা আড়াই’শ বছর ধরে হত্যাকাণ্ড ও অত্যাচার চালানো হয় কাফেরদের ওপর। তাদের জীবন জীবিকা এবং ধর্ম-সংস্কৃতির ওপর চলে বেপরোয়া ও নির্মম হামলা। উচ্চবিত্ত ও অভিজাতদের মধ্যে অনেকেই মরল, কিছু পালিয়ে বাঁচল, আর যারা মাটি কামড়ে টিকে রইলো তারা ত্রাসের মধ্যেই দিন রজনী গুণে গুণে রইল। কাজেই ধন, জন আর প্রাণের নিরাপত্তা যেখানে অনুপস্থিত, যেখানে প্রাণ নিয়ে সর্বক্ষণ টানাটানি, সেখানে সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চার বিলাস অসম্ভব। ফলে সে সময়ে সাহিত্য সংস্কৃতির উন্মেষ বিকাশের প্রশ্নই উঠেনা।’ ড. অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় মুসলমানদের সম্পর্কে লিখেছেন ‘শারীরিক বল, সমরকুশলতা ও বীভৎস হিংস্রতার দ্বারা বাংলা ও তাহার চতুস্পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ইসলামের অর্ধচন্দ্র খচিত পতাকা প্রোথিত হইল। ১৩শ হইতে ১৫শ শতাব্দীর শেষ ভাগ পর্যন্ত প্রায় দুই শত বছর ধরিয়া এই অমানুষিক বর্বরতা রাষ্ট্রকে অধিকার করিয়াছিল, এই যুগ বঙ্গসংস্কৃতির তামসযুগ, য়ুরোপের মধ্যযুগ ঞযব উধৎশ অমব- এর সহিত সমতুলিত হইতে পারে।’ ড. সুকুমার সেনের মতে ‘মুসলমান অভিযানে দেশের আক্রান্ত অংশে বিপর্যয় শুরু হয়েছিল।’ গোপাল হালদারের মতে তখন ‘বাংলার জীবন ও সংস্কৃতি তুর্ক আঘাতে ও সংঘাতে, ধ্বংসে ও অরাজকতায় মূর্ছিত অবসন্ন হয়েছিল। খুব সম্ভব সে সময়ে কেউ কিছু সৃষ্টি করবার মত প্রেরণা পায়নি।’
কোন কোন পণ্ডিতের মতে এসময়ে ‘বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বারম্বার হরণকারী বৈদেশিক তুর্কিদের নির্মম অভিযান প্রবল ঝড়ের মত বয়ে যায় এবং প্রচণ্ড সংঘাতে তৎকালীন বাংলার শিক্ষা, সাহিত্য, সভ্যতা সমস্তই বিনষ্ট ও বিলুপ্ত হয়ে যায়।’
ড. অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে ‘শারীরিক বল, সমরকুশলতা ও বীভৎস হিংস্রতার দ্বারা মুসলমানেরা অমানুষিক বর্বরতার মাধ্যমে বঙ্গসংস্কৃতির ক্ষেত্রে তামস যুগের সৃষ্টি করে।’ তিনি মনে করেন ‘বর্বর শক্তির নির্মম আঘাতে বাঙালি চৈতন্য হারিয়েছিল’ এবং ‘পাঠান, খিলজি, বলবন, মামলুক, হাবশি সুলতানদের চণ্ডনীতি, ইসলামি ধর্মান্ধতা ও রক্তাক্ত সংঘর্ষে বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায় কূর্মবৃত্তি অবলম্বন করে কোন প্রকারে আত্মরক্ষা করেছিল।’ তিনি আরও লিখেছেন ,‘তুর্কি রাজত্বের আশি বছরের মধ্যে বাংলার হিন্দু সমাজে প্রাণহীন অখণ্ড জড়তা ও নাম পরিচয়হীন সন্ত্রাস বিরাজ করিতেছিল।…কারণ সেমীয় জাতির মজ্জাগত জাতি দ্বেষণা ও ধর্মীয় অনুদারতা। ..১৩শ শতাব্দীর প্রারম্ভেই বাংলাদেশ মুসলমান শাসনকর্তা, সেনাবাহিনী ও পীর ফকির গাজীর উৎপাতে উৎসন্নে যাইতে বসিয়াছিল। শাসনকর্তৃগণ পরাভূত হিন্দুকে কখনও নির্বিচারে হত্যা করিয়া, কখনওবা বলপূর্বক ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করিয়া এ দেশে মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি করিতে আরম্ভ করেন। হিন্দুকে হয় স্বধর্ম ত্যাগ, না হয় প্রাণত্যাগ, ইহার যে কোন একটি বাছিয়া লইতে হইত।’ ভূদেব চৌধুরীর মতে, ‘বাংলার মাটিতে রাজ্যলিপ্সা, জিঘাংসা,যুদ্ধ, হত্যা, আততায়ীর হস্তে মৃত্যু-নারকীয়তার যেন আর সীমা ছিলনা। সঙ্গে সঙ্গে বৃহত্তর প্রজাসাধারণের জীবনের উৎপীড়ন, লুণ্ঠন, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ধর্মহানির সম্ভাবনা উত্তরোত্তর উৎকট হয়ে উঠেছে। স্বভাবতই জীবনের এই বিপর্যয় লগ্নে কোন সৃজনকর্ম সম্ভব হয়নি।’ তার মতে বখতিয়ার খিলজি মুসলিম বিজেতাদের চিরাচরিত প্রথামত বিগ্রহ মন্দির বিধ্বস্ত করে ধ্বংসস্তুপের মধ্যে গড়ে তুলেছিলেন নতুন মসজিদ। মাদ্রাসা ও ইসলামিক শিক্ষার মহাবিদ্যায়তন প্রতিষ্ঠা করে, বিধর্মীদের ধর্মান্তরিত করে ধর্মীয় উৎসাহ চরিতার্থ করেন। বিদেশী তুর্কিদের শাসনসীমা থেকে দীর্ঘকাল শাসিতেরা পালিয়েই ফিরেছে। পালিয়েছে প্রাণের ভয়ে,মনের ভয়ে, এমনকি ধর্ম সংস্কারের বিলুপ্তির ভয়ে। বস্তুত, বখতিয়ারের জীবনান্তের পরে তুর্কি শাসনের প্রথম পর্যায়ের নির্মমতা ও বিশৃংখলার প্রাবল্যের দরুণ এই পলায়নপ্রবণতা আরও নির্বারিত হয়েছিল।
১৩৪২ খ্রিস্টাব্দে ইলিয়াস শাহি সুশাসন প্রবর্তনের পূর্ব পর্যন্ত বাঙালির সামগ্রিক জীবন এক নীরন্ধ্র বিনষ্টির ঐতিহ্যে ভরপুর হয়েছিল। স্বভাবতই জীবনের সংশয়ে কালজয়ী কোন সৃজনকর্ম সম্ভব হয়নি। নিছক গতানুগতিক ধারায় যা কিছু রচিত হয়েছিল, তাও সর্বাত্মক ধ্বংসের হাত থেকে প্রায়ই রক্ষা না পাবারই কথা। (বাংলা সাহিত্যের ইতিকথা)। কিন্তু না, পণ্ডিত এবং এ ধারার ইতিহাসকারদের অভিমত পুরোপুরি সত্য নয়। আর ঐতিহাসিক সত্য এবং তথ্য সম্পর্কে যথাযথ অনুসন্ধানের মাধ্যমে অস্পষ্টতার ভিতরকার প্রকৃত সত্য উদঘাটনপূর্বক বিচার বিশ্লেষণমূলক পর্যালোচনার মাধ্যমে সম্যক ধারণা অর্জন না করে মতামত দেয়া কিংবা আংশিক সত্য ধারণা নিয়ে মতামত দেয়ার ক্ষেত্রেও সৃষ্টি হতে পারে বিভ্রান্তির ধূম্রজাল। প্রকৃত সত্য আবিষ্কারের পর আংশিক সত্যের পক্ষে সরলভাবে প্রদত্ত মতামতের অবস্থান হয়ে উঠতে পারে পুরোপুরি বিপরীতধর্মী। তখন তাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলা হলেও খণ্ডন করার পক্ষে কোন যুক্তির গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধই থেকে যায়। অথবা অবহেলা, কুটিলতা কিংবা অজ্ঞতার ছাপ পাণ্ডিত্যকে ম্লান করে দিতে চায়। পণ্ডিতদের ক্ষেত্রে এটি কারোই কাম্য নয়। তদুপরি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তথাকথিত অন্ধকার যুগ বা তামসযুগ প্রশ্নে এমন ঘটনার অবতারণা হয়েছে। যা মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসকে বিতর্কিত করেছে,বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে। কতিপয় পণ্ডিত এবং ইতিহাসকারের সস্তাদরের সরল কিংবা বিজাতীয় মনোভাবাপন্ন মতামতের মধ্যদিয়ে ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় ছেদ টেনে ধূম্রজাল সৃষ্টির মাধ্যমে মধ্যযুগে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে দেড়’শ বছরের সৃষ্ট সাহিত্যের মহামূল্যবান সম্পদ এবং তাদের রচয়িতাদের অবদান অস্বীকার করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু ঐতিহাসিক সত্যকে অস্বীকার করলেও চেপে রাখা যায় না। কেউ তার স্বীকৃতি দিক বা না দিক তাতেও কিছু যায় আসেনা। সে সত্য নিজ গুণেই স্বীকৃত।
সত্যিকারার্থে বাংলা সাহিত্যবর্জিত তথাকথিত অন্ধকার যুগের জন্যে তুর্কি বিজয় ও তার ধ্বংসলীলাকে দায়ী করে দেয়া বক্তব্য বিভ্রান্তিকর। ১২০০থেকে ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ের যে সব সাহিত্য নিদর্শন পাওয়া গেছে এবং এ সময়ের সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থার যে সব তথ্য উঠে এসেছে তাতে করে এ সময়কে অন্ধকার যুগ হিসেবে চিহ্নিত করার ধারণা ভুল বলেই মনে হয়; বরং অনুসন্ধানে প্রাপ্ত সাহিত্য নিদর্শন এবং রাজনৈতিক অবস্থার চিত্র পর্যালোচনায় অন্ধকার যুগের অস্তিত্ব স্বীকৃত হয় না, কিংবা খুঁজেই পাওয়া যায়না। ঐতিহাসিক সত্য হচ্ছে এই যে, অন্ধকার যুগের দেড়’শ বছর মুসলমান শাসকেরা ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে এ কথা মিথ্যা। ইলিয়স শাহি শাসন আমলের পূর্বে খিলজি,বলবন ও মামলুক বংশের ২৫ জন শাসক বাংলাদেশ শাসন করেছেন। তাদের কারো কারো রাজত্বকালে সর্বসাকুল্যে ১৫-২০ বছর মাত্র দেশে অশান্তি ছিল, অন্যদের বেলায় সার্বিক পরিবেশ শান্ত ছিল বলেই ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়। দিল্লির শাসকের বিরুদ্ধে কিংবা অন্তর্বিরোধে যে সব যুদ্ধ বিগ্রহ হয়েছে তা ছিল সীমিত পরিসরে, বৃহত্তর ও ব্যাপক জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রায় তার কোন প্রভাব পরেনি, যা জনজীবন বিপর্যস্ত হওয়ার কারণ হতে পারে। উপরন্তু বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষিতে ইসলামি শিক্ষাদীক্ষা, আচারব্যবহার, ধর্মকর্ম, আহারবিহার প্রভৃতি প্রবর্তনের মধ্যদিয়ে দেশবাসীর মধ্যে ইসলামি শান্তির পরিবেশ বিরাজ করছিল। মূলত এই শান্তির ধারায় মুসলমান শাসকেরা মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের ব্যাপক পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন। তাদের এই পৃষ্ঠপোষকতা এবং উৎসাহ উদ্দীপনা দানের ফলেই বাংলা ভাষা তার যথার্থ মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তা নাহলে ব্রাহ্মণ্যবাদীরা ‘অষ্টাদশ পুরাণানি রামস্য চরিতানি চ। ভাষায়াং মানবঃশ্র“ত্বা রৌরবং নরকং ব্রজেৎ॥’ বলে ধর্মীয় বিষয়াদি দেশীয় ভাষা তথা বাংলা ভাষায় প্রচারের ক্ষেত্রে যে বিধিনিষেধের বাণী উচ্চারণ করেছিল তাতে বাংলা সাহিত্যের ভবিষ্যৎ ছিল একেবারেই সম্ভাবনাহীন। প্রকৃতপক্ষে বাংলায় মুসলিম শাসন প্রবর্তনের মধ্যদিয়ে মুসলমান শাসকদের হাতের ছোঁয়ায়ই বাংলা ভাষা ও সাহিত্য তার দুর্দিন থেকে মুক্তি পেয়েছিল।
তাই বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে মুসলমান শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতার গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে ড. দীনেশচন্দ্র সেন ‘বাংলা ভাষা ও সাহিত্য’ গ্রন্থে লিখেছেন ‘আমাদের বিশ্বাস মুসলমান কর্তৃক বঙ্গ বিজয়ই বঙ্গভাষার এই সৌভাগ্যের কারণ হইয়া দাঁড়াইয়াছিল।’ তার মতে ‘মুসলমানগণ ইরান, তুরান প্রভৃতি যে স্থান হইতেই আসুন না কেন, এদেশে আসিয়া সম্পূর্ণরূপে বাঙালি হইয়া পড়িলেন।’ ক্ষিতিমোহন সেন ভারতে মুসলমান শাসকদের অবদানের কথা বিবেচনায় নিয়ে মন্তব্য করেছেন, ‘তাঁহারা দেশী ভাষার সমাদরতো করিয়াছেনই, সংস্কৃতেরও সমাদর করিয়াছেন।’ ড. মুহম্মদ এনামুল হক মন্তব্য করেছেন এভাবে ‘সেনদের কাছ থেকে মুসলিম তুর্কিরা বাংলাদেশ দখল করলেন কূটনীতি, শৌর্যবীর্য ও জ্ঞানগরিমার শ্রেষ্ঠত্বে। তখনকার দিনের নৈতিক ও রাষ্টীয় মাপকাঠিতে তাঁরা কোন অপরাধ করেননি। ফলে নির্যাতিত ও নিগৃহীত মানুষ মানুষের প্রাপ্য ইসলামি মর্যাদা পেল, সংস্কৃতের দৈব-আসন টলে গেল, ফারসি এসে তার স্থান দখল করল, আর বাংলা ভাষা ও সাহিত্য তার আপনভূমে পুণঃপ্রতিষ্ঠিত হল।’ তিনি মনে করেন ‘তুর্কি কর্তৃক বঙ্গবিজয় এক মহা অপরাধ বলে গণ্য হোক’ বা ‘এ বিজয়কে নরহত্যা লুণ্ঠন ও ধ্বংসের তাণ্ডবলীলা বলে চিহ্নিত’ করা অথবা এই বাংলা সাহিত্যবর্জিত যুগের জন্য তুর্কি বিজয় ও তার ধ্বংসলীলাই দায়ী’-এ ধরণের ধারণা কোন ভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। তাই তিনি বলেছেন ‘এ সময় বাংলার মানুষ নিজের সুখ-দুঃখের কাহিনী নিজের ভাষায় লেখেনি, কিংবা নিজের বিরহ মিলনের গান নিজের কথায় রচনা করেনি, এমন একটা অদ্ভুত পরিস্থিতির কথা ভাবতেও পারা যায়না।’
একথা না বললেই নয় যে, বাংলায় মুসলমানের শাসনামলে বাঙালির স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় কোন পরিবর্তন আসেনি। শুধু রাজক্ষমতারই পরিবর্তন হয়েছে সে সময়ে। বাঙালির অর্থনৈতিক ব্যবহারিক জীবন ব্যবস্থায় মুসলিম শাসকগণ কোন হস্তক্ষেপ তো করেনইনি; বরং তাদের সহানুভূতিশীল আচরণ এবং ইসলামের উদার নীতির দরুণ সমাজে শান্তি-শৃংখলা অব্যাহত থাকায় সৃষ্টিশীল জীবন ব্যবস্থা গড়ে তোলা পূর্বাবস্থার তুলনায় আরও সহজ হয়ে উঠেছিল। মুসলমান শাসকগণের উদারতা সম্পর্কে তৎকালীন ঐতিহাসিকগণের মতামত এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ড. সুকুমার সেন মন্তব্য করেছেন ‘রাজ্য শাসনে ও রাজস্ব ব্যবস্থায় এমনকি সৈন্যাপত্যেও হিন্দুর প্রধান্য সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল। গৌড়ের সুলতানেরা মুসলমান হইলেও রাজকার্য প্রধানত হিন্দুর হাতেই ছিল।’ বিনয় ঘোষের মতে ‘পাঠান রাজত্বকালে জায়গীরদারেরা দেশের ভিতরে রাজস্ব আদায়ের কাজে হস্তক্ষেপ করেন নি। দেশে শাসন ও শান্তি রক্ষার জন্য হিন্দুদের ওপরই তাঁদের নির্ভর করতে হত।’ ক্ষিতিমোহন সেন বলেছেন, ‘এ দেশে আসিয়া মুসলমান রাজারা সংস্কৃত হরফে মুদ্রা ও লিপি ছাপাইয়াছেন, বহু বাদশা হিন্দু মঠ ও মন্দিরের জন্য বহু দানপত্র দিয়াছেন।’ স্টুয়ার্ট লিখেছেন ‘অধিকংশ আফগানই তাদের জায়গীরগুলো ধনবান হিন্দুর হাতে ছেড়ে দিতেন। এই জায়গীরগুলোর ইজারা ধনশালী হিন্দুরা নিতেন এবং তাঁরা ব্যবসা বাণিজ্যের সমস্ত সুবিধা ভোগ করতেন।’ বখতিয়ার খিলজি সম্পর্কে ড. যদুনাথ সরকারের মন্তব্য হচ্ছে ‘বখতিয়ার রক্তপিপাসু ছিলেন না, অকারণে প্রজাদের ওপরে উৎপীড়ন কিংবা ব্যাপক বিধ্বংসে তাঁর কোন আগ্রহ বা আনন্দ ছিলনা।’
এতে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে এদেশে মুসলমান শাসনকালে কোন কোন পণ্ডিতের দেয়া মতামতের প্রেক্ষিতে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ, রক্তপাত, লুটতরাজ,অত্যাচার, নির্যাতন, নিস্পেষণের যে চিত্র বর্ণিত হয়েছে তা সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ নয়। বরং একদল সত্যানুসন্ধানী সর্বজন স্বীকৃত বিশিষ্ঠ পণ্ডিত ও ইতিহাসকারের মতে তার সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্রই দৃষ্টিগোচর হয় এবং তা সর্বৈব সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ। প্রকৃতপক্ষে মুসলমান শাসকগণের উৎসাহ, উদারতা ও পৃষ্ঠপোষকতাই বাংলা সাহিত্যকে তার গতিশীলতা বজায় রেখে যথাযথ মর্যাদায় সুপ্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছে। তাদের অবদানের মূল্যায়ন করতে গিয়ে ড. দীনেশচন্দ্র সেন তার ‘বঙ্গভাষা ও সহিত্য’ গ্রন্থে লিখেছেন ‘রাজকার্যাবসানে মুসলমান সম্রাটগণ পাত্র-মিত্র পরিবেষ্টিত হইয়া হিন্দু শাস্ত্রের বঙ্গানুবাদ শুনিতে আগ্রহ প্রকাশ করিতেন। ..মুসলমান সম্রাটগণ সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিগণের কৌতূহল নিবৃত্তির জন্যই রাজদ্বারে দীনাহীনা বঙ্গভাষার প্রথম আহ্বান পড়িয়াছিল।’ এতে বাংলা সাহিত্যের প্রতি তাদের অনুরাগ আনুকুল্যই প্রকাশ পায়। এসব কারণেই অন্ধকার যুুুগের সমর্থনে ভূদেব চৌধুরী প্রথমে মন্তব্য করা সত্ত্বেও পরবর্তীতে ইতিহাসের যথার্থ সত্যকে তিনি আর আড়াল করতে পারেননি। তাই ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিকথা’ প্রথম পর্যায় গ্রন্থে তিনি লিখেছেন ‘ত্রয়োদশ শতাব্দীতে যারা বাইরে থেকে বাংলাদেশ আক্রমণ করেছিলেন, অতদিনে সেই তুর্কি শাসকেরাই দেশীয় ঐতিহ্যের পরিপোষক রূপে নতুন ভূমিকা গ্রহণ করেছেন। সুশাসন সূত্রে এইসব বিদেশী শাসনকর্তা প্রজাসাধারণের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণেই কেবল তৎপর হয়েছিলেন না, দেশের সংস্কৃতি ও সাহিত্যের পুণর্বিন্যাসেও অনেক ক্ষেত্রে সহায়তা করেছিলেন।’
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস নিয়ে গবেষণাকারী বিশেষজ্ঞ পণ্ডিতদের অভিমত, অতীত দিনের লুপ্ত সাহিত্যের সম্পদ অনুসন্ধান প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়ে যায়নি। গবেষণা কর্মের দ্বারা নতুন নতুন তথ্য আবিষ্কারের মাধ্যমে সাহিত্য সম্পর্কে অবহিত হওয়ার প্রক্রিয়া চলমান। এরই অংশ হিসেবে তথাকথিত ‘অন্ধকার যুগ’ এর অপবাদ চাপিয়ে দেয়া দেড়’শ বছর ১২০০ থেকে ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ের উল্লেখযোগ্য সাহিত্য নিদর্শন রামাই পণ্ডিতের ‘শূন্যপুরাণ’ এবং হলায়ূধ মিশ্র রচিত ‘সেক শুভোদয়া’ আবি®কৃত হয়। তাছাড়া ওই সময়ে বাংলা সাহিত্যের ব্যাপক নিদর্শন পাওয়া না গেলেও অন্যান্য ভাষায় সাহিত্য সৃষ্টির নিদর্শন রয়েছে। প্রাকৃত ভাষায় গীতিকবিতা গ্রন্থ ‘প্রাকৃতপৈঙ্গল’ এসময়েই সংকলিত হয়। রামাই পণ্ডিত রচিত ‘শূন্যপুরাণ’ এবং এর ‘কলিমা জালাল’ বা ‘নিরঞ্জনের রুষ্মা’ ডাক ও খনার বচন, হলয়ূধ মিশ্র রচিত ‘সেক শুভোদয়ার’ অন্তর্গত পীর মাহাত্ম্যজ্ঞাপক বাংলা ‘আর্যা’ অথবা ‘ভাটিয়ালী রাগেন গীয়েত’ এবং রাহুল সাংকৃত্যায়ন এই সময়ে রচিত কিছু চর্যাপদ সংগ্রহ করে প্রকাশ করেন। উল্লিখিত সাহিত্য সম্ভার তথাকথিত অন্ধকার যুগে বাংলা সাহিত্য সৃষ্টির নিদর্শন হিসেবে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
শূন্যপুরাণঃ বৌদ্ধধর্ম যখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে তখন হিন্দু ধর্মের সাথে এর মিলন সাধনের উদ্দেশ্যে বৌদ্ধদের শূন্যবাদ ও হিন্দুদের লৌকিক ধর্মের সংমিশ্রণে ধর্মপূজার প্রতিষ্ঠা করেন রামাই পণ্ডিত। গদ্যপদ্য মিশ্রিত চম্পুকাব্য শূন্যপুরাণ ধর্মপূজার শাস্ত্রগ্রন্থ। এতে উল্লিখিত ধর্মপূজার বিভিন্ন দিক আলোচিত হয়েছে। শূন্যপুরাণে সন্নিবেশিত ‘নিরঞ্জনের রুস্মা’ নামক কবিতাটি থেকে সুস্পষ্ট প্রমাণ মিলে যে এটি ‘মুসলমান তুর্কি কর্তৃক বঙ্গবিজয়ের পরের’ অন্তত ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষের দিকের রচনা।’ এতে বর্ণনা করা হয়েছে বৌদ্ধধর্মাবলম্বী সদ্ধর্মীদের ওপর বৈদিক ব্রাহ্মণদের অত্যাচারের কাহিনী। পাশাপাশি মুসলমানদের জাজপুর প্রবেশ এবং রাতারাতি ব্রাহ্মণ্যদেবদেবীর ধর্মান্তর গ্রহণের কাল্পনিক চিত্র জুড়ে দেয়া হয়েছে। ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে অস্পষ্ট ধারণা থেকে অনুমিত হয় গ্রন্থটি বাংলাদেশে ইসলাম ধর্ম সম্প্রসারণের প্রথম দিকের রচনা। গ্রন্থটিতে একদিকে ব্রাহ্মণ্য শাসনের সমাপ্তি অপরদিকে মুসলমানদের শাসন শুরুর পক্ষে মতামতের প্রতিফলন ঘটেছে। নিম্নে এর ভাষার নমুনা উদ্ধৃত করা হলোঃ
আপনি চণ্ডিকা দেবী তিহঁ হৈলা হায়া বিবি’
পদ্মাবতী হৈলা বিবি নূর ।
জথেক দেবতাগণ সভে হয়্যা একমন
প্রবেশ করিল জাজপুর ॥
দেউল দেহারা ভাঙ্গে কাড়্যা ফিড়্যা খাএ রঙ্গে
পাখড় পাখড় বোলে বোল।
ধরিয়া ধর্মের পাএ রামাঞি পঞ্জিত গাএ
ই বড় বিষম গণ্ডগোল॥
উল্লিখিত রামাই পণ্ডিতের জীবনকালও ত্রয়োদশ শতক বলে অনুমান করা হয়। উদ্ধৃত ভাষার নমুনা এবং ব্রাহ্মণ্য শাসনাবসান ও মুসলমান শাসন প্রচলনের পক্ষে মত প্রকাশের মধ্য দিয়ে মূলত তৎকালীন সামাজিক অবস্থার পরিচয়ই মেলে ধরা হয়েছে।
সেক শুভোদয়াঃ সংস্কৃত গদ্যপদ্যের সংমিশ্রণে রচিত ‘সেক শুভোদয়া’ও একটি চম্পুকাব্য। বাংলায় সেন বংশের শেষ শাসক রাজা লক্ষ্মণ সেনের সভাকবি হলায়ূধ মিশ্র রচিত এ কাব্য সম্পর্কে ড. মুহম্মদ এনামুল হক বলেছেন ‘সেক শুভোদয়া খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীর একেবারেই গোড়ার দিককার রচনা।’ রাজা লক্ষ্মণসেন ও শেখ জালালুদ্দীন তাবরেজির অলৌকিক কাহিনী নিয়ে এটি রচিত। ‘শেখের শুভোদয় অর্থাৎ শেখের গৌরব ব্যাখ্যাই এই পুস্তিকার উদ্দেশ্য।’ গ্রন্থটিতে প্রাচীন বাংলার পীর মাহাত্ম্যজ্ঞাপক ৩টি বাংলা ছড়া বা আর্যা, খনার বচন এবং ভাটিয়ালী রাগের একটি প্রেম সঙ্গীত স্থান পেয়েছে। পণ্ডিত ও ইতিহাসকারদের মতে এগুলোই হচ্ছে বাংলা ভাষায় প্রাপ্ত পীর মাহাত্ম্যজ্ঞাপক কাব্যের প্রাচীনতম নিদর্শন। সেক শুভোদয়া প্রেম সঙ্গীতঃ
হঙ জুবতী পতিএ হীন।
গঙ্গা সিনায়িবাক জাইএ দিন॥
দৈব নিয়োজিত হৈল আকাজ।
বায়ু ন ভাঙ্গএ ছোট গাছ॥
ছাড়ি দেহ কাজ্জ মুঞি জাঙ ঘর।
সাগর মৈদ্ধে লোহাক গড়॥
হাত জোড় করিঞা মাঙ্গো দান।
বারেক মহাত্মা রাখ সম্মান॥
বড় সে বিপাক আছে উপাএ॥
সাজিয়া গেইলে বাঘে ন খাএ॥
পুন পুন পাএ পড়িআ মাঙ্গো দান।
মৈদ্ধে বহে সুরেশ্বরী গাঙ্গ॥
শ্রীখাণ্ড চন্দন অঙ্গে শীতল।
রাত্রি হৈলে বহএ আনল॥
পীন পয়োধর বাঢ়ে আগ।
প্রাণ ন জায় গেল বহিঞা ভার॥
নয়ান বহিঞা পড়ে নীর নিতি।
জীএ ন প্রাণী পালাএ ন ভীতি॥
আশে পাশে স্বাস করে উপহাস।
বিনা বায়ুতেঁ ভাঙ্গে তালের গাছ॥
ভাঙ্গিল তাল লুম্বিল রেখা।
চলি যাহ সখি পলাইল শঙ্কা॥
‘সেক শুভোদয়া’র প্রেম সঙ্গীতটিতে প্রাচীন যুগের ব্যক্তি মানস এবং সমাজ চিত্রের সুস্পষ্ট প্রতিফলন ঘটেছে। এটিকে প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের একমাত্র নিদর্শন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তথাকথিত অন্ধকার যুগে সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছে। প্রাপ্ত সংখ্যায় তা কম হলেও গুণে মানে কোন কোন কাব্য অনন্য বৈশিষ্টের অধিকারী ও উৎকর্ষপূর্ণ। বাংলা সাহিত্যে প্রাচীন যুগের নিদর্শন চর্যাপদের পর ধারাবাহিক এবং যথার্থ সাহিত্য চর্চা না হলে মধ্যযুগের প্রথম গ্রন্থ বড়–চণ্ডীদাসের ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’এর মত উৎকর্ষপূর্ণ কাব্য সৃষ্টি যে সম্ভব হতনা একথা নিশ্চিত করে বলা যায়। ওই সময়ে উল্লিখত সাহিত্য নিদর্শন ছাড়াও সাহিত্য রচিত হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু তুর্কি বিজয়ের পূর্বে বাংলা লেখ্য ভাষার মর্যাদা না পাওয়া, ধর্মপ্রচার ও রাজ্যশাসনের বাহন না হওয়া, মুসলমানদের আগমনের পূর্বে সংস্কৃতের প্রাধান্য এবং রাজকার্যে বিদেশী ভাষা ব্যবহারের ফলে তখনকার অপরিণত বাংলা ভাষার গুরুত্ব বিবেচিত হয়নি। তাছাড়া মানুষের চিরাচরিত জীবনযাপন ব্যবস্থা, আবহওয়া, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারী, আকস্মিক দুর্ঘটনাসহ নানাবিধ প্রতিকুলতায় হয়তোবা সে সময়ে কোন সাহিত্য নিদর্শনের অস্তিত্ব দীর্ঘদিন টিকে থাকা সম্ভবপর ছিলনা। বাংলা প্রাকৃতজনের ভাষা হওয়ায় উচ্চবিত্তের লোকেরা বাংলায় সাহিত্য সৃষ্টির আগ্রহ দেখায়নি। চর্যাগীতি, সেক শুভোদয়া, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন এর মাত্র একটি করে পাণ্ডুলিপি তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। যদি এই ১টি করে পাণ্ডুলিপি পাওয়া না যেতো তবে এসবের অস্তিত্বও বিলীন হতো বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে। ইত্যকার বহুবিধ প্রতিকুলতায় হয়তোবা বাংলা সাহিত্যের সে সময়কার মূল্যবান বহু রচনা আজও দৃষ্টির অন্তরালেই রয়ে গেছে। তা সত্ত্বেও যা পাওয়া গেছে এসব নিদর্শনের ভিত্তিতেই নিশ্চিত করে সে সময়কে অন্ধকার যুগের অপবাদ থেকে নিস্কৃতি দেয়া চলে। সুতরাং ১২০০খ্রিস্টাব্দ থেকেই মধ্যযুগের সূচনা। অন্ধকার যুগ বলে বাংলা সাহিত্যে কোন যুগের অস্তিত্বের অসারতা উক্ত সময়ের প্রাপ্ত সাহিত্য নিদর্শনের ভিত্তিতেই প্রমাণিত। এসব তথ্য উপাত্ত ও সাহিত্য নিদর্শনের পর্যালোচনার মাধ্যমে পণ্ডিতগণ মনে করেন তথাকথিত অন্ধকার যুগ বলে বাংলা সাহিত্যে কোন যুগের অস্তিত্ব অপবাদ ভিন্ন অন্য কোনভাবে স্বীকার করা যায় না। কারণ মধ্যযুগের সূচনা পর্ব থেকে বাংলা সাহিত্য যথার্থ ও ধারাবাহিক চর্চার মধ্যদিয়ে ক্রমেই উৎকর্ষের পথে অগ্রসর হয়ে বর্তমান আধুনিক যুগের চরমোৎকর্ষের পর্যায়ে উপনীত হয়েছে।
সুতরাং বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মধ্যযুগের সূচনা লগ্নে ১২০০ থেকে ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দেড়’শ বছর সময়কে অন্ধকার যুগ বা তামস যুগ হিসেবে চিহ্নিত করে কতিপয় পণ্ডিতের দেয়া মতামত সঠিক কি বেঠিক, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কিংবা অজ্ঞতার ফসল এরূপ মন্তব্য নি¯প্রয়োজন। সে সময়ের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পরিবেশ, শাসন ব্যবস্থা,প্রাকৃতিক অবস্থার প্রেক্ষিত এবং প্রাপ্ত বাংলা সাহিত্যের নিদর্শনসমূহের আলোচনা,পর্যালোচনা, উদ্ধৃতি ও তথ্য উপাত্তের ভিত্তিতে একথা বলাই সমীচীন তথাকথিত অন্ধকার যুগের দাবি অমূলক, ভিত্তিহীন। প্রকৃতপক্ষে বাংলা সাহিত্যে অন্ধকার যুগের দাবি সে সময়কার সৃষ্ট বাংলা সাহিত্যের মূল্যবান অবদানকে অস্বীকার করার অপচেষ্টা কিংবা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অপবাদের কালিমা লেপন করারই নামান্তর। সুতরাং অন্ধকার যুগের অস্তিত্ব অনাহুত, অকল্পনীয়, আবেগতাড়িত কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, অবাস্তব চিন্তা ও স্থুল যুক্তির ফসল। চন্দ্র সূর্যের অবস্থান যেমন এক আকাশে একই সময়ে হতে পারে না, তেমনি বাংলা সাহিত্যের আলোকিত একটি নিদর্শন বিদ্যমান থাকলেও কোন একটি যুগের মধ্যবর্তী কিছু সময়কে ‘অন্ধকার যুগ’ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়না।
সর্বোপরি বলা যায় মধ্যযুগের অর্থাৎ১২০০ খ্রিস্টাব্দের শুরুর দিকে ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ ত্রয়োদশ শতকের শুরুর দিকে ‘সেক শুভোদয়া’ এবং শেষের দিকে ‘শূন্যপুরাণ’র অস্তিত্ব বিদ্যমান থাকা অবস্থায় এ সময়টাকে তথাকথিত ‘অন্ধকার যুগ’ হিসেবে চিহ্নিত করা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে একটি ‘অপবাদ’ লেপনের অপচেষ্টা ছাড়া আর কিছুই হতে পারেনা।